নারায়ণগঞ্জে গণধর্ষণের পর খুন হওয়া সেই কিশোরী জীবিত উদ্ধার প্রশ্নবিদ্ধ পুলিশ নির্দোষরা জেলে

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি : নারায়ণগঞ্জে জিসামনি নামে ১৫ বছরের এক স্কুল ছাত্রীকে গণধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার অভিযোগে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ধৃতরা আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে পুলিশ এমনটাই জানিয়েছিল গণমাধ্যম কর্মীদের। অথচ সেই জিসাকে ৫১ দিন পর স্বামীর বাড়ি বন্দর থানা এলাকা থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। এ নিয়ে জেলায় সৃষ্টি হয়েছে তোলপাড়। পুলিশের তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিজ্ঞমহল।

ঘটনার একমাস পর গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের জবানবন্দির বরাত দিয়ে জেলা সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছিলেন, প্রেমের সূত্র ধরে প্রেমিক আবদুল্লাহ গত ৪ জুলাই বিকেলে একট্ িইজিবাইকে করে জিসাকে নিয়ে ঘোরাঘুরি করে। পরে তাকে নিয়ে যায় শহরের পাঁচ নম্বর ঘাট এলাকায়। সন্ধ্যায় খলিল মাঝির নৌকা ভাড়া করে তারা নদী যায়। ওই নৌকাতেই মেয়েটিকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে নৌকার মাঝি খলিল ও আব্দুল্লাহ। বিষয়টি প্রকাশ করে দিবে বললে মেয়েটিকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে লাশ নদীতে ফেলে দেয়। তবে তাদের দেয়া স্বীকারোক্তি অনুযায়ী খোঁজ করেও নিহতের মরদেহ খুঁজে পায়নি পুলিশ।

এ ঘটনায় পুলিশ বন্দর উপজেলার বুরুন্ডি খলিলনগর এলাকার আমজাদ হোসেনের ছেলে আব্দুল্লাহ (২২), বুরুন্ডি পশ্চিমপাড়া এলাকার সামসুদ্দিনের ছেলে রকিব (১৯) ও নৌকার মাঝি খলিলকে (৩৬) গ্রেপ্তার করে। গত ৯ আগস্ট আসামিরা নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মিল্টন হোসেন ও হুমায়ুন কবিরের আদালতে পৃথক ভাবে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে বলে জানায় পুলিশ। আসামিরা বর্তমানে জেলহাজতে রয়েছেন। মামলার পর মেয়ের মায়ের মোবাইলের কললিস্ট চেক করে প্রথমে রকিবের সন্ধান পায় পুলিশ। রকিবের মোবাইল নম্বর দিয়ে আব্দুল্লাহ নিহত কিশোরীর সঙ্গে যোগাযোগ করতো বলে পুলিশের দাবি। ঘটনার দিন ওই নম্বর দিয়ে জিসাকে কল করেছিল আবদুল্লাহ। এ সূত্র ধরে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।

চাঞ্চল্যকর বিষয় হচ্ছে গত ২৩ আগস্ট (রোববার) দুপুর আড়াইটার সময় বন্দরের নবীগঞ্জ রেললাইন এলাকার একটি মোবাইল ফোনের দোকান থেকে জিসা তার মা রেখা আক্তারকে ফোন করে জানায় সে বেঁচে আছে এবং সুস্থ আছে। তবে তার কিছু টাকার প্রয়োজন। মৃত মেয়ের মোবাইল ফোন পেয়ে মা বাবা হতবম্ভ হয়ে যায়। প্রথমে প্রতারক মনে করলেও কিছুক্ষণ কথা বলার পর নিশ্চিত হয় এটা তাদের মেয়ে জিসা। তখন বিকাশে দুই হাজার টাকা পাঠিয়ে ওই দোকানে ছুটে যান জিসার মা-বাবা। বিষয়টি পুলিশকে জানায় তারা। পরে পুলিশ জিসা মনিকে বন্দর থানার কুশিয়ারা এলাকা থেকে উদ্ধার করে সদর মডেল থানায় নিয়ে আসে। সে এখন পুলিশ হেফাজতে আছে। বন্দরের কুশিয়ারা এলাকার ইকবাল নামে এক যুবককে বিয়ে করে এতদিন তার সাথেই সংসার করেছিল জিসা এ সত্যি প্রকাশ পায়। পুলিশ জিসার স্বামী ইকবালকেও গতকাল সোমবার আটক করেছে।

অপর দিকে চাঞ্চল্য তৈরি করা এই ঘটনায় মুহুর্তেই তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের উপর ােভ ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। এলাকাতে শুরু হয় তীব্র সমালোচনা। তবে এতদিন পর মেয়েকে জীবিত পেয়ে খুশি মা-বাবা। তবে মেয়েকে উদ্ধার করার জন্য পুলিশ টাকা নিয়ে উদ্ধার চেষ্টা না করে আমার মেয়েকে গণধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ নদীতে ফেলে দেওয়ার অভিযোগে নির্দোষ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে দায় মুক্ত হওয়ার তামাশা করেছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন কিশোরীর মা রেখা আক্তার।

উল্লেখ্য, গত ৪ জুলাই থেকে নিখোঁজ ছিল জিসা মনি (১৫)। সে দেওভোগ পাক্কা রোড সরকারি প্রাইমারি স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। অনেক খোঁজাখুজির পর মেয়েকে না পেয়ে ৬ আগস্ট সদর মডেল থানায় অপহরণ মামলা করেন বাবা জাহাঙ্গীর হোসেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নিযুক্ত হয় উপপরিদর্শক (এসআই) শামীম আল মামুন। মামলার এজাহারে বলা হয় আসামি আব্দুল্লাহ জিসাকে স্কুলে যাওয়া আসার পথে প্রেমের প্রস্তাব দিত। এতে বাধা দিলে মেয়েকে অপহরণের হুমকি দেয়। আবদুল্লাহ ও তার সহযোগীরা জিসাকে অপহরণ করে।

নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো: আসাদুজ্জামান জানান, জিসাকে উদ্ধার করার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সে পুলিশ হেফাজতে রয়েছে। গ্রেপ্তার তিন আসামি কেন এই রকম জবানবন্দি দিয়েছে সেটা বলতে পারছি না। আমরা তাদের আবার রিমান্ডে এনে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। মামলার তদন্তের কোন ঘাটতি কিংবা অবহেলা ছিল কিনা জানতে চাইলে তিনি তা অস্বীকার করে বলেন, আদালতে জবানবন্দি দেওয়ার েেত্র পুলিশের কোন হাত থাকে না। সেখানে ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। এমনটা কেন হলো তা তদন্ত সাপেে বলা যাবে।